পাইকগাছায় পাউবো কর্মকর্তার নির্দেশে কলোনির লেকের মাছ লুট? উঠছে গুরুতর অভিযোগ
পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি
খুলনার পাইকগাছায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতাধীন একটি সরকারি কলোনির লেক থেকে বিপুল পরিমাণ মাছ আহরণ ও বিক্রির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট এক পাউবো কর্মকর্তার নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানেই সরকারি জলাশয় থেকে মাছ ধরে বিক্রি করা হয়েছে। তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তা দাবি করেছেন, মাছগুলো সরকারি অর্থে ছাড়া হয়নি; বরং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত অর্থে চাষ করা মাছ আহরণ করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ৭ জুন সকালে পাইকগাছা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কলোনি সংলগ্ন লেখকের মধ্যে প্রায় ৩০০ হাত লম্বা কাটি জাল দিয়ে মাছ ধরা হয়। কয়েক ঘণ্টার অভিযানে রুই, কাতলা, তেলাপিয়া, ভেটকিসহ বিভিন্ন প্রজাতির বিপুল পরিমাণ মাছ আহরণ করা হয়। পরে মাছগুলো স্থানীয় এক মাছ কটা ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকাবাসীর মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, সরকারি অফিসের নিয়ন্ত্রিত লেক থেকে মাছ আহরণ ও বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের উন্মুক্ত দরপত্র, লিজ বা লিখিত অনুমোদনের তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে বিক্রয়লব্ধ অর্থ কোথায় গেছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি কতটা বৈধ ছিল, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, সরকারি সম্পত্তির আওতাভুক্ত কোনো জলাশয় থেকে মাছ আহরণ ও বিক্রির ক্ষেত্রে প্রচলিত বিধি-বিধান অনুসরণ করা জরুরি। অন্যথায় বিষয়টি আর্থিক অনিয়ম কিংবা সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ঘাটতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, পাউবোর ১৬ নম্বর পোল্ডারের শাখা কর্মকর্তা (এসও) মোতালেব হোসেনের নির্দেশনায় মাছ ধরার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল কি না, সে বিষয়টি স্পষ্ট নয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. মোতালেব হোসেন, উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পুর)/শাখা কর্মকর্তা (এসও), পাইকগাছা পানি উন্নয়ন সেকশন-১ (পোল্ডার-১৬ ও ২৩), বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বলেন, “ওই লেকে সরকারি অর্থে মাছ চাষ করা হয়নি। আমাদের আগের কয়েকজন সহকর্মী ব্যক্তিগতভাবে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা করে দিয়ে মাছ ছেড়েছিলেন। পরে সেই মাছ ধরা হয়েছে। এটি সরকারি রাজস্বের মাছ নয়, তাই রাজস্ব খাতে জমা দেওয়া হয়নি।”
তিনি আরও জানান, এলাকার কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়েই মাছ ধরা হয়েছে। এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীকে অবহিত করা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “উনাকে জানানো হয়নি।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহির মাজহার পরে কথা বলছি বলে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী বলেন, এটা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিষয়গুলো তাদের নিজস্ব প্রশাসনিক আওতাধীন। এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দপ্তরের।
পানি উন্নয়ন বোর্ড যদি কোনো বিষয়ে সহযোগিতা চেয়ে আমাদের কাছে লিখিতভাবে পত্র দেয়, তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও সহযোগিতা করা হয়।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রিত কলোনির লেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে মাছ চাষের কোনো লিখিত অনুমোদন ছিল কি না এবং সরকারি স্থাপনার ভেতরে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার বিধান রয়েছে কি না।
ঘটনার আরেকটি বিতর্কিত দিক হলো, বক্তব্য দেওয়ার একপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা প্রতিবেদকের কাছে একটি বিকাশ নম্বর চান বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এদিকে স্থানীয়রা দাবি করেছেন, পুরো ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন করা হোক। তাদের মতে, যদি সরকারি সম্পদ ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া হয়ে থাকে, তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। অন্যদিকে, কর্মকর্তার দাবি সত্য হলে সেটিও যথাযথ নথিপত্রের মাধ্যমে জনসম্মুখে তুলে ধরা প্রয়োজন।
পাইকগাছার এই ঘটনাটি এখন শুধু একটি লেকের মাছ আহরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি সরকারি সম্পদের ব্যবহার, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও অবস্থানের দিকে তাকিয়ে রয়েছে স্থানীয় জনসাধারণ।
